সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ১০:০৩ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঝালকাঠি
অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা চেয়ে সবার আগে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিয়েছিলেন ইমাম হোসেন শান্ত (১৮) নামের এক যাত্রী। ফায়ার সার্ভিস তাকে জানিয়েছিল, ‘আমাদের নৌযান বরিশালে। যেতে একটু দেরি হবে। আপনার লোকেশন বলুন।’
নদীর মাঝে পড়ে থাকা লঞ্চে তখন আগুনের শিখা। শান্ত বুঝতে পারছিলেন না কোথায় আছেন। উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে মোবাইলে নেট সংযোগ নেন। খোলেন গুগল ম্যাপ। এরপর ফায়ার সার্ভিসকে জানান লোকেশন। কিন্তু ঘটনাস্থলে নৌ-দমকল আসে এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট পর।এ ধরনের অগ্নিনির্বাপনে যে ধরনের যান ব্যবহার করে ফায়ার সার্ভিস, দেশে সেটা আছে মাত্র দুটি। একটি পটুয়াখালীতে, আরেকটি বরিশালে। বরিশালের নৌ-দমকলের জলযানটি ২২ বছরের পুরনো। বয়সের ভারে গতিও কমেছে ওটার। তাই দ্রুত যেতে পারেনি ঘটনাস্থলে।
ঝালকাঠির ফায়ার স্টেশনের সদস্যরা রওনা দেন সাধারণ ট্রলারে করে। ততক্ষণে পুরো লঞ্চেই আগুন ধরে যায়। সাধারণ ট্রলার নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ায় সময়মতো ও দরকারি গতিতে পানি ছিটাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। আগুন নেভাতেও বেশ বেগ পেতে হয় তাদের।
ফায়ার সার্ভিসের অপেক্ষা করতে করতে অনেকের গায়ে আগুন ধরে যাচ্ছিল। এমন দৃশ্য দেখার পরই মোবাইলটাকে পলিথিনে ভরে নেন শান্ত। বাকি সব ফেলে ঝাঁপ দেন নদীতে। কিছুটা সাঁতরানোর পর এলাকাবাসী তাকে টেনে ট্রলারে করে তীরে নিয়ে আসে। এরও প্রায় একঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস আসে ঘটনাস্থলে।
সোমবার (২৬ ডিসেম্বর) লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিসকে প্রথম খবর দেওয়া তরুণ যাত্রী শান্ত। তিনি নিজেও লঞ্চ থেকে বের হওয়ার সময় পায়ে আঘাত পান। তবে চোখের সামনে মানুষের আগুনে পোড়ার দৃশ্যটাই তাকে ভোগাচ্ছে বেশি।
শান্তর বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার চান্দখালী এলাকায়। স্থানীয় মোশাররফ হোসেন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায় আছেন। একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন।
২৩ ডিসেম্বর বিকাল আড়াইটার দিকে উত্তরার মামার বাসা থেকে সদরঘাটে যান। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অভিযান-১০ লঞ্চে ওঠেন। দ্বিতীয় তলার ডেকে সিঁড়ির পাশে ছিল তার আসন।
গণমাধ্যমকে শান্ত বলেন, “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ টের পাই পিঠে তীব্র গরম লাগছে। চোখ মেলে দেখি সব অন্ধকার। রং পোড়ার গন্ধ। কালো ধোঁয়ায় কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। লঞ্চও চলছে না। নারী, পুরুষ ও শিশুদের কান্নার শব্দ আসছিল কানে।
শান্ত আরও বলেন, ‘ইঞ্জিনের পাশে ছিল দুটি মোটোরসাইকেল, এছাড়াও লঞ্চের হোটেলের দুটি সিলিন্ডার এবং লঞ্চের জ্বালানির কয়েকটি গ্যালন। এর মধ্যে বিকট শব্দে কি যেনও একবার বিস্ফোরণ হলো। তারপর সব কিছু আরো আগুন লেগে যায়’।
সিঁড়ির পাশেই ছিলাম। ইঞ্জিন বরাবর দোতলার সিঁড়ির পাশে দেখি আগুন। নিচে ইঞ্জিনের পাশেও আগুন। কোনোরকম দোতলা থেকে নামি। লঞ্চের বাইরের দিকে যে বাড়তি অংশটা থাকে, সেখানে যাই। পাশ দিয়ে হেঁটে সামনের দিকে এগোতে থাকি। দেখি একজনের গায়ে আগুন ধরেছে, তাকে আরেকজন ঠেলে পানিতে ফেলে দিলো। ওই সময়কার চিৎকারগুলো যে কত ভয়ানক ছিল, না শুনলে বিশ্বাস করবে না কেউ।
কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। রাত তখন ৩টা ১৩। হঠাৎ মনে পড়লো ৯৯৯-এর কথা। ফোন দিলাম। ১ মিনিট ১৩ সেকেন্ড কথা হয় অপর প্রান্তে। তারা আমার লোকেশন জানতে চাইলো। আমি বুঝতে পারছিলাম না কোথায় আছি। এরপর লাইন কেটে মোবাইলের নেট কানেকশন অন করি।
Leave a Reply