বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন
সম্পাদক
সবকিছুরই কি শেষ নেই? নিশ্চয় শেষ আছে। শেষ আছে করোনাযুদ্ধেরও। যুদ্ধের শেষে ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকে। করোনার এই যুদ্ধ যখন শেষ হবে, দেখা যাবে অনেক কিছুরই ভাঙচুর ঘটেছে। বহু মানুষ মারা গেছে, যাদের বেঁচে থাকার কথা ছিল। প্রকৃত হিসাব বের করা কঠিন হবে, তবে মৃত্যুর ঘটনা মেনে নেওয়া আরও কঠিন হবে বেঁচে-যাওয়া আপনজনের পক্ষে। প্রায় সব দেশেরই জীবন থেকে একটা বছর খোয়া গেছে। মানুষের গড় আয়ু এক বছর কমে গেল, আমেরিকানরা বলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এমনটা একবার নাকি আমেরিকাতে ঘটেছিল। এবারকার ঘটনাও কিন্তু একটা বিশ্বযুদ্ধের মতোই। তবে আমেরিকানরা এটাও লক্ষ্য না-করে পারেনি যে তাদের দেশে বিপদটা গেছে কালো চামড়ার লোকদের ওপর দিয়েই অধিক মাত্রায়। একজন সাদা প্রাণ হারালে তিনজন কালোর প্রাণহানি ঘটেছে। সব দেশের অর্থনীতিই বিপর্যস্ত। তবে ক্ষতিটা গরিব দেশ ও গরিব মানুষেরই ঘটেছে সর্বাধিক। গরিব দেশের গরিব মানুষের তো কথাই নেই। গরিব দেশ আরও গরিব হলো, গরিব মানুষের দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পেল। এমনটাই অবশ্য হওয়ার কথা ছিল। মানুষ বেকার হয়েছে, ছোট ছোট ব্যবসায়ী নিজেদের পুঁজি ভেঙে খেয়েছে। কীভাবে উঠে দাঁড়াবে তারা জানে না। এর মধ্যে আবার কিছু মানুষ, সংখ্যা তাদের খুবই অল্প, নিজেদেরটা খুবই সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিয়েছে; তারা আরও ধনী হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক গবেষক একযোগে বলেছেন, মানুষের এই বিপদের মধ্যে বিশ্বের দশজন ধনী ব্যক্তি এতটাই ধনী হয়েছেন যে, সেটা রীতিমতো ‘লজ্জাজনক’।
দুমড়েমুচড়ে গেছে মানবিক সম্পর্কও। মানুষের মহত্ত্ব যে দেখা যায়নি, তা অবশ্য নয়। আক্রান্ত রোগীদের নিরাময়ে অসংখ্য চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী যেভাবে দিনরাত কাজ করেছেন, সেটা যে শুধু চাকরির জন্য, তা নয়; মানবিক সংবেদনাও কার্যকর ছিল। চিকিৎসা ও টিকা উদ্ভাবনে বৈজ্ঞানিকদের যে গবেষণা, তাকেও সাধারণ বলা যাবে না। এ ফাঁকে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো ওষুধ কোম্পানি ও হাসপাতাল যে ধরনের মুনাফালিপ্সা দেখিয়েছে, রীতিমতো ভয়াবহ। ফেসবুক ও টুইটারের মতো তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাদের ব্যবসার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।করোনাভাইরাস নিজে কিন্তু মানুষের মহত্ত্ব বা মুনাফা সংগ্রহের জন্য সুযোগের সদ্ব্যবহার- এ দুইয়ের কোনোটাই দেখতে চায়নি। করোনাভাইরাসের ঘোষণাটি ছিল মানুষকে পুরোপুরি অমানুষে পরিণত করার। মানুষ তো একটি প্রাণীই, আর পাঁচটা প্রাণীর মতোই। নিজেকে সে যে অন্যদের তুলনায় সেরা ঘোষণা করেছে, সেটা তার সৃষ্টিশীলতা ও সামাজিকতার জন্য। সৃষ্টিশীলতা বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত। এবং উভয়েরই বিকাশ ঘটে সামাজিকভাবেই; সামাজিকতার ভেতর দিয়ে। মানুষের একেবারে প্রথম পরিচায়ই হলো- সে একটি সামাজিক প্রাণী। করোনাভাইরাস ঠিক ওই পরিচয়ের জায়গাতেই আক্রমণ করে বসেছে। মানুষকে সে জানিয়ে দিয়েছে- অতি-আধুনিক এই বিশ্বে মানুষের টিকে থাকার প্রথম শর্তই হবে অসামাজিক হওয়া। বাঁচতে হলে নাকচ করে দিতে হবে সর্বপ্রকার সামাজিকতাকে; হতে হবে আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, বিবরবাসী; আদিমের চেয়েও আদিম।
হাজার হাজার বছরের সাধনায় মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার এক দ্বীপের গুহার ভেতরে মানুষের আঁকা পশুর ছবি পাওয়া গেছে। গবেষকরা মনে করেন, এ ছবি আঁকা হয়েছে কমপক্ষে ৪৫ হাজার ৫শ বছর আগে। ইতোপূর্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় মানুষের আঁকা মানুষের ছবির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল; সে-ছবি আরও পুরোনো, ৭৩ হাজার বছর আগের। অগ্রগতির এ রকম অগুনতি প্রমাণ বিদ্যমান। সভ্যতার অগ্রগতির এক পর্যায়ে পুঁজিবাদ এসেছে এবং তা পৃথিবীতে এনেছে অভূতপূর্ব প্রাচুর্য। সঙ্গে সঙ্গে আবার সে মানুষের বিমানবিকীকরণও ঘটিয়েছে। এই বিমানবিকীকরণ শুধু যে যান্ত্রিকতা বা ভোগ-বিলাসিতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই ঘটল, তা নয়। বিমানবিকীকরণ দেখা গেল মানুষকে পরস্পর-বিচ্ছিন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক করার ভেতরেও। করোনাকালে বিচ্ছিন্নতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার চরম প্রকাশ ঘটেছে। তার ভেতরের বাণীটা হলো, তুমি ততটাই নিরাপদ যতটা তুমি অসামাজিক। আটকেপড়া মানুষদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও হতাশা বাড়ল, হিংস্রতা উগ্র হলো। প্রতারণার কৌশলগুলো দক্ষ থেকে দক্ষতর হলো। ধর্ষণ ও আত্মহত্যা দুটোই বৃদ্ধি পেল। দক্ষিণ কোরিয়াকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল বলা হয়। সেখানে আত্মহত্যার হার আগেও বেশি ছিল; করোনার সময়ে তা নতুন উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে। বেশি করে ঘটছে মেয়েদের আত্মহত্যা। মেয়েদের আত্মহত্যার এ ব্যাপারটা অবশ্য কোনো ব্যতিক্রম নয়; যে কোনো প্রকার বিপর্যয়ে মেয়েরাই ভুক্তভোগী হয় অধিক মাত্রায়।
বিষণ্ণতা, বিষাদ ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠলে বিশেষভাবে মনে পড়ে কবি জীবনানন্দ দাশকে। আমাদের অনেকের মতো তার জীবনেও আনন্দটা ছিল কম। করোনা পরিস্থিতি তাকে সহ্য করতে হয়নি; চলে গেছেন তা প্রায় ৭০ বছর হয়ে গেল। তাই বলে মানুষের জীবনে কম কষ্ট কিন্তু তিনি দেখে যাননি। করোনার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রেখেছে যে-তরুণরা, তাদের কয়েকজন মিলে একটি লিটল ম্যাগাজিনের করোনা সংখ্যা বের করেছে। নাম দিয়েছে ‘এবং মানুষ’। এর সম্পাদকীয়র শুরুতে তারা উদ্ধৃত করেছে দেখছি জীবনানন্দের বিষণ্ণ দুটি লাইন- ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন/ মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীর কাছে।’
খুবই সত্য কথা। পৃথিবীর গভীর অসুখ গভীরতর হয়েছে, তবুও মানুষের ঋণ ওই পৃথিবীর কাছেই। পৃথিবী বলতে প্রকৃতি এবং মানুষ দুটোই বোঝায়। সবুজ প্রকৃতির কাছে যেতে হবে, যেমন যেতে হবে মানুষের কাছে। প্রকৃতি গ্রামে যত থাকে শহরে থাকে তার চেয়ে কম। বাংলাদেশে তো দেখা গেল, করোনার প্রকোপও শহরের তুলনায় গ্রামে স্বল্প। তাই বলে গ্রাম যে বসবাসের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, তা কে বলবে। উপযোগী হলে গ্রামের বসবাস গুটিয়ে মানুষ স্রোতের মতো শহরে চলে আসত না, যেমনভাবে তারা এসেছে। করোনার আক্রমণে দিশেহারা হয়ে অনেক মানুষ গ্রামে ফিরে গেছে; কিন্তু গ্রামে তো জীবিকার বন্দোবস্ত নেই। গ্রামে গিয়ে তারা যে গ্রামবাসীর উপকার করবে, তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নিজেদের উপকার? সেটা তো আরও অসম্ভব।
Leave a Reply